কবিতা

মুতাকাব্বির মাসুদের একগুচ্ছ কবিতা

মুতাকাব্বির মাসুদের একগুচ্ছ কবিতা


একজীবনের গল্প


তোমার সময় আর আমার সময় কখনো
এক হবেনা নন্দিনী!
নিত্যানন্দ এখন আর আগের মতো নেই!
সে এখন মহুয়ার শরবতে বিভোর!
তার নেই প্রেম-নেই বিরহ!
সে বুঝে গেছে দূরে থাকার মজাই আলাদা!
তবে একদিন তুমিও বুঝবে কাছে থেকে দূরে থাকার
কী যে জ্বালা!
তখন সব কথা- চিত্ত ব্যথা,
জোড়া দিলেও অনুরাগের অথৈ জলে ডুবে মরবে ;
বেঁচে থাকার স্বাদ হয়তো জাগবে
কিন্তু চিদানন্দ নিজে জ্বলে নক্ষত্রের বাসর আর আলোকিত করবেনা।
নিয়তিও যে মহুয়ার শরবতে বিভোর
সে খবর তুমি আগেও রাখোনি এখনও না!
তাই জোড়া বালার বৃত্তে বন্দি তুমি আমৃত্যু নন্দিনী!
মুক্তি তোমার কোনো কালেই ছিলো না!
কালও ছিলো না, আজও না আগামীতেও
মিলবে বলে মনে করি না!
তুমি শাস্ত্র মেনে চলো-আমি মানি না।
শাস্ত্র কখনো জীবন থেকে বড় হতে পারে না।
যেতে পারো একমাত্র উজানে।
তুমি ছিলে আমি ছিলাম।
নদীর জলে আরো উজানে সাঁতার কেটে
ঢেউয়ের নিতল অন্তর কেটেকেটে
তুমি হারিয়ে ছিলে তোমার কুসুমিত যৌবনের পদাবলি, আমি পেয়েছিলাম কারুকার্যময় ঝিনুকের
যতনে রাখা অতুল সৌরভ!
শুক্তির ভেতর থেকে ওঠে আসা উষ্ণ নিসাসে
তুমি আর আমি খুঁজে ছিলাম আকাশের ঐ পাড়ে বিশ্বাসের বিভব।
দীঘির জলে নেমেছিলাম ভেসেছিলাম – দুরন্ত প্রত্যয়ে মৃত্যুকে নিয়েছিলাম একের ভেতর
শূন্যকে আলিঙ্গন করে।
আমি মরেছিলাম – তুমি ভেসে গেলে,
অদৃশ্য বাঁচার নিরঙ্কুশ আবেগের কাছে
সেই তুমি সমর্পিত ; তবে কেনো বলোনি আগে
মৃত্যু তোমার চাই না?
এবার তুমি-ই বলো এ প্রেম শেখালো কে?
তুমি না ঈশ্বর?
তবে আমি মৃত্যুঞ্জয়ী হতে চায়নি
শুধুই প্রণয়ের অবিন্যস্ত বিভার স্পর্শ খুঁজেছিলাম
তোমার শোভিত প্রাকৃত শরীরের আলোকিত
গলির ভেতর চরম বিশ্বাসে !
তুমি না জানলেও নিশিক্লান্ত শিশিরের
আদুরি শৈবলিনী- দিঘির জল সে কথা জানে!
এবার ঈশ্বর তুমি-ই বলো?
এ প্রেমে কে দায়ী? তুমি না আমি?
পৃথিবীতে মৃত্যু কেনো দিলে?
দিলেই যদি সমান সমান দাওনি কেনো ?
তুমি কী মরেছো কভু?
মরণের কী যে যন্ত্রণা – জ্বালার কী যে বিভৎস দহন
তা কি তুমি জানো?
আমি নিশ্চিত-সে তুমি জানো না!
বিরহের অনল তোমার শাস্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ!
নন্দিনী আমি আজও খুঁজি তোমাকে।
তপ্ত বাতাসের বিরহী অনুরাগের শিসে ;
আজও দেখি তোমাকে।
হেরে কি যাওনি তুমি?
আমি দেখি তুমি দেখো না!
যদি মুক্তি খুঁজো তবে ভেঙ্গে ফেলো
অচল এই শাস্ত্রীয় বালার বৃত্ত!
তন্বী মেঘের স্রোতের মতো ভাসাও নিজেকে
উড়াল শেখো অনঘ- উর্বশী প্রজাপতির মতো!
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
২০-০৯-২০২০


কৃষ্ণ সাপের হলুদ বিষ


উঁচু টিলা!
গাধার পিঠে রোদের পাহাড়
পরিপাটি মখমল নিতম্ব- আহা!
ঢেউ খেলানো শরীরতো নয়
রক্ত খেকো জোঁক!
নেশার নিশিত, স্বপ্ন ওড়ে তার জঘনে!
আদিরসে জাবড় কাটে মহাকালের ঠোঁটে!
স্বপ্ন কী আর মাগনা হাঁটে গাধার পিঠে?
জোড়া চোখের নীল মোহনা ‘ছুঁইতেমরা’ চোখ কৃষ্ণসাপের হলুদ বিষ ! গোটা সকাল উধাও!
লাল কমলের নীল পাপড়ি আগুনখালে ভাসে
সাধু কবে সন্ন্যাস হলো শুনেছো কী কবে?
শুনো মিয়া!
হাতি একখান গাড়ায় আছে
চামচিকারা পাশেই!
পিঁপড়া একখান কামড় দিলে ভূমিকম্প ওঠবেই!
তাই বলে ভেবোনা-সময় তোমার পাল্টে গেছে!
লালমুলারও সাদা শরীর-ছিলে একবার দেখোনা!
গঙ্গা যদি রাঙা হয় লোহিত তবে কী?
মনে রেখো!
ঢেউ যখন ওঠবে মিয়া
ভাসায় দেবে সবই !
“””””””””””””””””””””””””””””””””””
১৯-০৯-২০২০


চাষা


মাফ করে দে না ভাই
আমি চাষা ছিলাম চাষাই থাকি
পোয়াতি মাটির সোঁদা গন্ধ ছাড়া আমার চলেই না!
ঐ মাটির ভেজা শরীরে
আমার মায়ের ছায়া;চোদ্দপুরুষের পায়ের ছাপ!
বয়সী আঙুলের স্যাঁতসেঁতে চিপাগলিতে
দগদগে ঘায়ের গন্ধ
আমাকে আমার পূর্বপুরুষ চিনতে শেখায়!
ঐ যে ঈশানের ভাঙ্গা জানালা-
এখানে আমার পূর্বপুরুষের লাঙ্গল-জোয়াল
আর মই-বাঁশের নিড়ানি-পাশেই ঢেঁকির চাতাল!
চারপাশে কেমন এক অহংকারী গন্ধ আমার মায়ের!
আমি চাষার ছেলে
পেঁকো-কাদায় মাখামাখি
জীবন খুঁজি ছন নেড়ার চবুতরের অন্তঃপুরে
নারকেলের ছোবড়ায় পাকানো দড়ির
ঝুলানো কুর্তায় আমার সেই কৃষাণি
চোদ্দপুরুষের ছায়া!
আমি চাষার ছেলে
আমি আমার পূর্বপুরুষের সাথে থাকতে চাই
যখন দিনের প্রথম আলো ফজরের আজান মাখে গায়- কুয়াশায় ভিজেভিজে উঁকি মারে পুবের দিগন্তে
তখন নামাজ শেষে রক্তে স্পন্দিত হয়
সুরমাই রঙের আঁটালো মাটির গন্ধ
আর দলেদলে চাষারা ছুটে
জল বিছানো খানাখন্দে ভরা অমসৃণ পথে
যেনো মাঠ তার জীবিকার পালকি-
বুক তার মাটির দলা!
আমি চাষার ছেলে
নগর সভ্যতা আমাকে টানে না
এখানে গাঁয়ের মানুষের মতো
আমাকে কেউ চেনে না!
এই নগরে মানুষের চেয়ে কুকুরের মূল্য বেশি
হাভাতে মানুষ মরে- কুকুর মরে না
আমিতো দেখেছি উজান সকালে
কুকুরের মুখে ছিটিয়ে দেয়া খাদ্য-
দেখেছি বঞ্চিত মানুষের হাহাকার
খাবার চেয়ে ধনাত্মক আশ্বাস মেলেনি কখনো-
বলতে পারিনি তাঁদের
গাঁয়ের কোথাও কি তোমাদের বাড়ি ?
আমার মগজে খেলে
একটি মানবিক নগর- দৃশ্যমান সহবস্থান
অতি সভ্যতার এই রকমারি নগরে
মানবতা নেই
মমতা নেই
কিষানের গন্ধ নেই,
গাঁয়ের গন্ধ নেই,
মায়ের গন্ধ নেই-মাটির গন্ধ নেই এখানে।
নেই চাষার হৃদয় কুঁড়ে
ফলানো ফসলের গন্ধ!
“””””””””””””””””””””””””””
২৪-০৯-২০২০

 

 

Related Posts