স্মৃতিকথা

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিকথা- স্মৃতির বাতিঘর

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিকথা
স্মৃতির বাতিঘর


১৯৭৪-৭৫ এর দিকে আমরা নানা বাড়ি(গাজিপুর,কাপাশিয়া) থাকি। আব্বা ঢাকায়।আমি তখন মায়ের কাছে শুয়ে বসে ক্লাশ টু পর্যন্ত পড়ে ভালোই জ্ঞান অর্জন করছিলাম।নানাবাড়িতে মায়ের ইমিডিয়েট ছোটভাই আমার মোমেন মামা।উনি তখন কাপাশিয়া ডিগ্রি কলেজে বি, এ র ছাত্র।বাড়িতে দক্ষিণ পাশে বাংলা ঘর।বিশ্রাম,দরবার,মিটিং,গান,নাচ,ইনডোর খেলা,আড্ডা ব্যাপক। ‘৭১ সালেও দেখেছি এখানে মুক্তিসেনাদের মিটিং,যুদ্ধের প্লান,হাতিয়ার ধোয়ামোছা।আমার শিশুমনে ভয়, কৌতূহল এর মিশেল অনুভূতি।
মোমেন মামার ঘরে রেডিওতে নীনা হামিদ,আব্দুল আলীম,আব্বাসউদ্দিন আর রণাঙ্গনের গানের শ্রোতায় সরগরম ছিলো বাংলাঘর।বিবিসির খবর শুনতে গিয়ে তিন ব্যান্ডের রেডিওটাকে তার দিয়ে বাঁধা হয়েছে। একলাইন শোনা যায়, আর বাকিটা শোঁ শোঁ,পুঁই পুঁই।
আমি বুঝতাম বাকি ঘরগুলো মনে হয় ইংরেজী,অংক ঘর। পরে বুঝেছি বৈঠকখানাগুলোকেই বলা হয় বাংলাঘর।
কখনো শামা পাগল,বজলু, খুশু পাগলিরাও আসতো।তাদের রং ঢং আর আমাদের কে কত হেসে গড়াগড়ি খেতে পারি। শামা পাগল গাইত, টিক্কা খানেরে উক্কা ভইরা দে…। বজলু ধা-ধা ধরতো।খুশু পাগলি নাচতো।
রাত গভীর পর্যন্ত মামা পড়তেন।
বড় একটা চৌকিতে আমরা শিশুদের ৫/৭জনের দলটা সন্ধ্যার পরপরই কুপির আলোতে সমস্বরে পড়ছি। যদিও দ্রুত ঢুলতে শুরু করেছি। নানার এক দুর সম্পর্কীয় ভাই (আচ্ছিল্লা নানা বলে ডাকতাম)আসুক এটাই চাইতাম। উনার বিস্ময়কর অট্টহাসি,কৌতুক,ধাঁ-ধাঁ,পল্লী গীতির লোভেই তাকে জড়িয়ে ধরে আবেদন করতাম।তিনি ফেলতেন না। রাত নয়টা দশটাও বেজে গেছে আড্ডা চলছে।নানার ক্লান্তি নেই। আমরা কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়েছি।কেউ ঢুলছি।কাউকে খালা,মামিরা খাওয়াতে নিয়ে গেছেন।
আচ্ছিল্লা নানা চলে গেছেন।বাইরে ভূতুম ডাকছে। মোমেন মামা পড়তে বসেছেন।উনার কন্ঠে রবীন্দ্রনাথ এর সোনার তরী কবিতাটা প্রথম শুনি।উনার আবৃত্তি শুনে আমিও অনেকটা মুখস্ত করে ফেলি। উনার মুখে প্রথম আইনস্টাইন, লেনিন এর নাম শুনি। আইনস্টাইন এর একটি অংকও তার কাছে পাই, বেশ মজার।
ঘরে মুজিব, ইন্দিরা,তাজউদ্দীন এর ছবি নিয়ে কত প্রশ্ন জাগত ছোট্ট মনে।মামার বিরক্তি নেই। উত্তর দিচ্ছেন।মাটির দেয়ালে সভিয়েত নারী পত্রিকার পাতা আঁঠা দিয়ে লাগানো। ওখানে মজদুর শব্দটার অর্থ বুঝতে চাইলাম।মামা কি যেন কঠিন কঠিন কথায় উত্তর দিলেন।
মামা ৭৫ এর পরে সেনাবাহিনীতে গেলেন।তার আত্মীয়রা মুক্তিযোদ্ধা, তাই সম্ভবত চাকরীটা তাড়াতাড়ি চলে গেল। আবার চলে এলেন।ঢুকলেন জালালাবাদ গ্যাসে।সিলেটে দীর্ঘ সময়। শেষ হোলোনা চাকরি। হৃদযন্ত্রে রিং পড়তে হোলো দুর্ভাগ্যবশত। জিহবাটা অসাড়। কথা বলার জন্য কত চেষ্টা।মাদ্রাজ থেকেও পজিটিভ কিছু হোলো না।
আমার সাহিত্যগত ধারনার অন্যতম উৎস মামা! শারীরিকভাবে অন্য কোন কম্প্লিকেশন নাই,কেবলি কথা বলতে না পারার কষ্ট তার! মনে পরে তার সাথে ঘুরে ঘুরে লালমাটির পথে শালবনে,বিলঝিলে, হাটবাজারের চিত্তাকর্ষক অভিজ্ঞতার আস্বাদ করেছি কত।পাখি শিকার,মাছধরা,ফলমূল সংগ্রহের বন্যসুখের সে স্মৃতিপট মুছে যায় কি?

Related Posts