ছোটগল্প

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছোটগল্প- জোছনায় ফেরারী চাঁদ

জোছনায় ফেরারী চাঁদ
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ


“হৃৎপিণ্ডটা স্তব্ধ। দোহাই জ্বালাবেন না।”
পোস্ট দেবার পর পরই তিন হাজার লাইক। কমেন্ট পড়ে সময় নষ্ট করার জন্য সময় হাতে নাই।
অনর্থক লাইক পেতে পছন্দও করি না। কারো কারো কমেন্টের শব্দ, বানান ভুল দেখলে দয়া হয়। আগ বাড়িয়ে কিছু বলে ফেললাম, তো কেউ কেউ ক্ষেপে গিয়ে একটা কিছু বলেই ফেলেন। নিস্তার নেই।
আনার নামের বন্ধুটি এমন ধরণের। হাসি ঠাট্টা বোঝে না। সমালোচনা হজম করার শক্তি কম।
লোকটা স্ট্রোক করে। ডাক্তার সাহেবের সেই সিনেমাটিক ডায়লগ…আই’ম সরি।
আনার পানখোর না। বিড়ি চুরুট টানেনি। সংসারটা ছোটই। আয় উপার্জনের সুযোগ অল্প।
তবুও সুখ।
তবুও শান্তির নীড়।
সেই লোকটাই স্ট্রোক। তাও আবার সিভেয়ার। ব্রেনের পেছনে ব্লাড ক্লটিং। জটিলতা বেশ।
ঘাড় মোটা ডাক্তারদের বুদ্ধিদীপ্ত চোখের পুতুলি পুটুসপাটুস নড়েচড়ে।
বিষয়টা নিয়ে বেশিদূর এগিয়ে যেতে হলো না।
আনার মারাই গেছে।
যাবেই তো। মৃত্যুর চেয়ে সত্য আর কিছুই তো নেই।

সেই আনার আজকের পোস্টে লাইক দিলো! কমেন্ট করলো!
কী-করে সম্ভব!
ওরতো জমজ কিংবা ছোট বড় ভাইও নেই।
ওর মৃত্যু সংবাদে মাসখানেক বিমর্ষতা নিয়েই কেটেছে।
ওর মোবাইল নাম্বারটা ডিলিট করতে গিয়ে চুপচাপ কখন যে চোখের অশ্রুগ্রন্থিগুলোর আনচান শুরু হয়েছে টের পাওয়া যায়নি।
ফ্রেন্ড লিস্টে আনারের আইডিটার একটা চমৎকার ক্রিয়েটিভ হেডিং ছিল- “জোছনায় ফেরারী চাঁদ”।
ওটাকে ডিলিট করতে হাত কেঁপে ওঠে ।
দিন নব্বুইটা পেরুনোর মাথায় “জোছনায় ফেরারী চাঁদ” আইডি থেকে লাইক!
একটা কমেন্টও- বেঁচে থাকার বেশ সখ ছিল। কিন্তু হৃদপেশীর বিরূপ ছেলেমানুষীর কাছে হেরে গেলাম। আফটার অল, তোর লেখাগুলো থেকে বঞ্চিত হলাম ।

আনার বেঁচে নেই এবং ওর শরীরের মাংশল অস্তিত্বকে হাজার চেষ্টা করেও পূর্ব রূপে অন্তত পৃথিবীর একালে হবে না।
তাহলে পোস্টে লাইক কমেন্ট কি আনারের আত্মার কাজ?
শরীরের রক্ত কণাগুলোর ছুটোছুটি লুটোপুটি চুপটি মেরে বসে। একটা ঘর্মাক্ত আবহে মুহ্যমান আমি।
ওই কাল্পনিক চরিত্রের ম্যাসেঞ্জারে নক করি-

হা-ই।

ওপাশের সংলাপ- শরীরের যত্ন নিস। দিনকাল খারাপ। প্রেসার, ব্লাড সুগার, কোলেস্টেরল চেকাপে রাখিস।

ঠিক আছে। কিন্তু আনার ,তুই কই?

আমি তোর আশপাশের ঝোঁপ ঝাড়েই আছি। রোজ রোজ কচুর ডগায়, তেলাকুচোর ঠুনকো লতায়, নটেগুল্মের কাঁটায় কাঁটায়।কখনো শোঁয়া পোকা, কখনো লাল পিঁপড়ে, হলুদ প্রজাপতি…

ফেসবুক লগ আউট করে ফেললাম।
বিদ্যুৎ চলে গেছে চারঘন্টা আগে। থেকে থেকে দমকা বাতাসে নারকেলের গাছগুলোর মধ্যেই বাতাসের বাড়তি আগ্রহ। ভাঙা ডালপালা টিনের চালে পড়ে। আর কলিজার তারে তারে ভূতুড়ে ঝংকার তুলে যায়।
মায়ের রেখে যাওয়ার এক ঘন্টার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া ভাত, ডালের বাটি, ডাঁটা মলার চচ্চড়ির প্রতি আগ্রহটা গেছে। বিছানা থেকে নামছে না মনটা। ফাজিল চিকাটা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পালিয়েছে।
ঝড়ের পরপরই ফটফটা শাদা জোছনা। আলোর স্নিগ্ধতা নিয়ে নিরাপদে তরঙ্গগুলো দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি ঠিক নেই।
পরদিনই আনারের বউ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খিক খিক করে হাসছিল।
আপনের লেখাটা পড়ে মনে ধরেছিল। আনারের আইডিটা দিয়ে শুরু করেছি। মাঝেমধ্যেই একটু লাইক টাইক দিয়েন। আমিতো আবার আনারের মতো লিখতে পারি না ।

Related Posts