গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রবন্ধ

ড.এস এ মুতাকাব্বির মাসুদের গবেষণা প্রবন্ধ- তারাশঙ্করের উপন্যাস : দ্যোতিত উনিশ শতক [পর্ব-৫ (শেষ পর্ব)]

তারাশঙ্করের উপন্যাস : দ্যোতিত উনিশ শতক [পর্ব-৫ (শেষ পর্ব)]
ড.এস এ মুতাকাব্বির মাসুদ 


বস্তুত পাশ্চাত্য যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনে
ক্রমগ্রসরমান, ভারতবর্ষের সমাজজীবনে তখনো মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থাই বিদ্যমান।ইংরেজ আগমনে
এ অঞ্চলে মধ্যযুগীয় জীবনব্যবস্থা আক্রান্ত হলেও ইংরেজ তার ঔপনিবেশিক স্বার্থে এ জনপদে দীপ্তিময় সভ্যতায় একটি সুষ্ঠু সমাজ বিকাশে কখনো এগিয়ে আসেনি।এমনকি দ্যোতিত উনিশ শতকের শেষের দিকেও এখানে গ্রামীণ জনপদে একধরণের স্থিতাবস্থাই বিদ্যমান সত্য বলে চিহ্নিত হয়। ফলে আধুনিক প্রগতিশীল চেতনাসমৃদ্ধ সভ্যতার দ্যোতক উনিশ শতক
এ জনপদে যেমন উদ্ভাসিত হতে পারে নি তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সভ্যতার মন্ত্রে উদ্দীপ্তও হয় নি !
পল্লীসমাজের কাঠামোগত অর্থনৈতিক পরিবর্তন সামান্যই এবং কৃষি,ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে উৎপাদন শক্তি ও বিনিয়োগ কিংবা উৎপাদিত পণ্যের বিপণনে
এক বন্ধ্যবস্থা বিদ্যমান ছিলো।চাষাবাদে ও ক্ষেতে-খামারে প্রযুক্তিগত মান ছিলো মধ্যযুগীয়;গ্রামীণ জনপদে প্রচল মূল্যবোধ ও অনুভূতির ক্ষেত্রে সমকালীন সমাজে মধ্যযুগীয় সংস্কার ও ধর্মচেতনা-উপলব্ধির মৌলিক অনুষঙ্গ হিসেবে সক্রিয় ছিলো।
উনিশ শতকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর উদ্ভূত সমকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে নানা আন্দোলন-সংগ্রাম ছিলো শহরকেন্দ্রিক।শহরের কোলাহল তখনো গ্রামীণ জনপদকে স্পর্শ করেনি।
পল্লীর জনমানুষের জীবনযাত্রায় স্থবিরতা তখনো ছিলো।ক্রমেই এ দৃশ্যপট পরিবর্তিত হতে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের(১৯৩৯-১৯৪৫) সর্বগ্রাসী ধ্বংসযজ্ঞের অব্যবহিত পর থেকে। তবে এ উদ্ভূত সংকটের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তীকালে।
বিশ শতকের শুরুতেই নানা আন্দোলন- সংগ্রামে সামাজিক জীবন ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠে।
একদিকে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি অন্যদিকে এ জনপদের নিঃস্ব দারিদ্র্য পীড়িত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত
গণমানুষের স্বাধীনতার দাবি ক্রমশ গ্রামীণ নিস্তরঙ্গ জীবনেও মুক্তির স্লোগানে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।শহর থেকে সে আন্দোলন অতি দ্রুতই গ্রাম থেকে গ্রামে সম্প্রসারিত হয়।অতঃপর সে আন্দোলন একসময় জাতীয় রূপ নিয়ে রাজনৈতিক কার্যকলাপের সাথে সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ গণমানুষের অবিন্যস্ত জীবনকে
রাজনীতিক চেতনায় সক্রিয় করে তোলার পাশাপাশি
সভ্যতায় উজ্জীবিত জীবন্মুক্তির আধুনিক চেতনায়ও সম্পৃক্ত করে ফেলে। এ ধারায় রাষ্ট্র সম্বন্ধীয় ধ্যান-ধারণা
ও নিরীক্ষিত প্রচল চিন্তগুলো ক্রমেই আধুনিক হয়ে ওঠলো। এর ক্রমবর্ধমান দুর্বার চেতনা একসময় গ্রামীণ জনপদের নিরীহ মানুষগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে
পরিণত করে তুলে। সমকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব অবশেষে চলে যায় তথাকথিত জাতীয় বুর্জোয়া ও মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির হাতে। হয়তো সে কারণেই গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে তেমন কোনো রাজনৈতিক গণআন্দোলন গড়ে ওঠতে দেখা যায় নি! এ উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোও তারাশঙ্করের উপলব্ধির ব্যাপ্তি থেকে বিয়োজিত ছিলো না।শরৎচন্দ্র
যা তাঁর সাহিত্যে তোলে আনেননি-তারাশঙ্কর অবলীলায় তা অনায়াস চিত্রণের প্রয়াস পেয়েছেন।তিনি তাঁর ‘চৈতালী ঘূর্ণি’তে সমকালীন পরিবর্তিত সমাজের নিরীক্ষ্যমাণ চিত্রের অভিজ্ঞান সফলাতার সাথে দক্ষতায় উদ্ধৃত করে প্রান্তিক মানুষের জীবনালেখ্য তোলে এনেছেন।কারখানার প্রভাবে মানুষের ব্যক্তিজীবনের দ্রুত পরিবর্তনের চিত্রটিও গুরুত্বের সাথেই বিজ্ঞাপিত করেছেন ; দেখিয়েছেন খেটে খাওয়া মানুষের যান্ত্রিক জীবনের দৃশ্য পরম্পরাগত ক্রমপরিবর্তনের ধারা।
বস্তুত তারাশঙ্কর সমকালীন প্রবহমান যুগের
বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থাকে জীবনবাস্তবতায় নিরীক্ষিত ধনাত্মক পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন।তিনি দেখিয়েছেন সমকালের প্রান্তিক গণমানুষের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের চিত্র ; প্রচল জীবনধারায় নতুন যুগের সমন্বয়ে পূঁজিবাদী সমাজে ধনিক শ্রেণির নিয়ন্ত্রিত এক অপ্রতিরোধ্য শিল্পযুগের প্রসার।এ যান্ত্রিক সভ্যতা কীভাবে গ্রামীণ সরল মানুষদের ক্রমেই সমাজের সংস্কার, কৃষ্টি, রীতি ও বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করেছে তারও চিত্র তিনি তাঁর সবকটি উপন্যাসে শিল্পদক্ষতায় দৃশ্যমমান করে তুলেছেন।তাই বাংলাসাহিত্যে কালজয়ী আঞ্চলিক উপন্যাসের একজন কীর্তিমান Craftsman বলা হয় তারাশঙ্করকে।

“””””””””””””””””””””””””””””””
২৮-০৪-২০১৮
“””””””””””””””””””””””””””””””

 

 

 

Related Posts