গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রবন্ধ

ড. এস এ মুতাকাব্বির মাসুদের গবেষণা প্রবন্ধ- আঞ্চলিক উপন্যাস : তারাশঙ্করের অনুক্ত উপলব্ধি

আঞ্চলিক উপন্যাস : তারাশঙ্করের অনুক্ত উপলব্ধি
ড. এস এ মুতাকাব্বির মাসুদ


উপন্যাস হচ্ছে সাহিত্যের আধুনিক শিল্প।যেখানে জীবনের সামগ্রিক চিত্রটাই সারস্বত চেতনায় উপস্থাপিত হয়।এরই পাশাপাশি ক্রমায়াত  উপন্যাসশিল্পের অধুনা বিস্তারে পৃথক সত্তায় বিশেষ শিল্প হিসেবে আবির্ভূত হয় আঞ্চলিক উপন্যাস।প্রান্তিক জনপদের প্রচল-অপ্রচল ভাষার সন্নিবেশ;যন্ত্রণাকাতর  মাটি আর মানুষের জীবনের ক্লান্ত শরীরের সোঁদা গন্ধ নিয়ে,কঠিন- সরল গতিতে প্রবহমান এ আঞ্চলিক উপন্যাস সাধারণের, প্রান্তিকের এযেনো এক বিক্ষত মানচিত্র। সুখ- দুখ নদীর স্রোতের মতো উত্তাল কখনো শান্ত কখনো মাতাল তরঙ্গ নদীর দু’কোল প্লাবিত করে গড়ে তোলে নন্দিত শিল্প;জীবনের কঠিন ইতিহাস এক সকরুণ জীবন বাস্তবতার দৃশ্যমান চিত্রকলা। এখানে কোনো একটি বিশেষ জনপদের আঞ্চলিক জনজীবনের সমগ্র চিত্রটাই তুলে আনা হয়। বৈশ্বিক বিবেচনায় সমকালে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সকল দেশেই আঞ্চলিক উপন্যাসের ক্রমোদ্ভব ও বিকাশ লক্ষ্য করা যায়।আঞ্চলিক উপন্যাসের অন্যতম অভিপ্রেত রোমাঞ্চ আর ইতিহাসের স্পর্ধীত দেয়াল ভেঙ্গে মানুষের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের নবীকৃত চেতনায় মাটি আর মানুষের কাছাকাছি আসা।এ লক্ষ্যেই সামগ্রিক জীবনের সম্পূরক অংশটুকু সাথে নিয়ে সমাজ বাস্তবতার কোমল-কঠিন পথে উনিশ শতকেই আঞ্চলিক উপন্যাসের দ্যুতিত যাত্রা। অতঃপর সাহিত্যের মেধাবী উঠোনে নিরীক্ষ্যমাণ অনুসন্ধিৎসু পথে প্রজ্ঞায় পরিবৃত

অনুভূতির উদ্দীপ্ত বোধ থেকেই এক বিস্ময়কর নির্মাণ “আঞ্চলিক উপন্যাস “! বৈশ্বিক সাহিত্য ভাবনায় সংশ্লেষিত হয় এক নবীভূত শিল্প এবং বিশ্বসাহিত্যের আঞ্চলিক সারস্বত সমাজ। সফল  সাহিত্যচর্চার বিশ্বায়নের যুগে  সমকালে বৈশ্বিক সাহিত্যধারায় উপন্যাসের এ বিশেষ ও ব্যতিক্রমী শাখার উপস্থাপনে

নিজেকে প্রথম মেলে ধরার প্রয়াস পান পাশ্চাত্য ঔপন্যাসিক Thomas Hardy(১৮৪০-১৯২৮। তাঁর হাত থেকে অবিরাম বেরিয়ে আসে কাল জয়ী যত উপন্যাস। এগুলো যথাক্রমে -‘ Jude the Obscure'(1895),’Under the Green wood tree'(1872),’Far from the Madding Crowd ‘(1874),’The Mayor of the Caster bridge'(1886),’The Return of the Native'(1878),’The Woodlanders'(1887),’Two on A Tower'(1887),Tess of the d’Urbervilles'(1891),

প্রভৃতি। বিশ্বসাহিত্যাঙ্গনে Thomas Hardyকে আঞ্চলিক উপন্যাসের রূপকার বলা হলেও ইংরেজি কথাসাহিত্যের উদার প্রাঙ্গনে প্রথম আঞ্চলিক উপন্যাসের স্বীকৃতি দেয়া হয় এ্যাংলো আইরিশ ঔপন্যাসিক Maria Edgeworth(1768-1849)কে।তিনি-ই প্রথম তাঁর উপন্যাসে আঞ্চলিকতার ভাষাগত

শৈল্পিক বিলোড়নে সমৃদ্ধ করে তোলেন প্রান্তিক জনপদের ভাষা, সংস্কৃতি, সংস্কার, ধর্ম,ইতিহাস-ঐতিহ্যকে।বলা চলে আঞ্চলিকতার মৌল সংশ্লেষ তাঁর হাতেই শিল্পোৎকর্ষে বিভাবিত হয়। পরম্পরাগত ভৌগলিক প্রতিবেশ;বৈশ্বিক জীবনের ভাষা-সংস্কৃতি,ধর্ম-সংস্কার,বিশ্বাস ও প্রথার সুনির্দিষ্ট এবং নৈর্ব্যক্তিক এক বিস্ময়কর নকশা প্রণয়নে তার উপন্যাস জীবন ঘনিষ্ঠতায় অনন্য হয়ে ওঠে। Maria-ই প্রথম কথাসাহিত্যিক যে তাঁর উপন্যাসে আঞ্চলিকতার  রকমারি রূপবৈচিত্র্য গুরুত্বের সাথে প্রজ্ঞাপিত করতে

দক্ষতার অনন্য স্বাক্ষর রেখেছেন।তাঁর উপন্যাসে যে সব অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, ভৌগলিক,এবং সমকালীন জীবন বাস্তবতায় বিদ্যমান ও পরম্পরাগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনিন্দ্য অনুষঙ্গগুলো বিজ্ঞাপিত হয়েছে সে অঞ্চলগুলো হলো-আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েসেকস ও ওয়েলস প্রভৃতি।সে সময় তাঁর বিরামহীন সাহিত্যচর্চায়  সর্বজনীন  সমাদৃত ও নন্দিত সব উপন্যাসের পরিচয়ও আমরা পেয়ে থাকি। এগুলো  হলো ;’The parents Assistant ‘(1796),’Castle Rackrent'(1800),’Belinda'(1801),’The Absentee'(1812),’Ormond'(1817) প্রভৃতি। বস্তুত Maria তাঁর ‘Ormond’এবং ‘Castle Rackrent’এ তুলে এনেছেন আইরিশদের সমাজজীবনের বিদ্যমান অসংগতি,ধর্ম-প্রথা,সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্য। বস্তুত Maria অনেকটা নৈয়ায়িকের মতো সমকালীন সমাজ বাস্তবতায়  নিরীক্ষিত প্রজ্ঞার দীপিত আলোয় নিজেও নিষ্ঠতায় প্রভাবিত হয়ে পড়েন আঞ্চলিক জীবন ও ঐতিহ্যের পরম্পরাগত বিস্ময়কর এক অনিরুদ্ধ ও অনির্বচনীয় শিল্পের উৎসের সন্ধানে।Maria ও তাঁর সমসাময়িক ইংরেজি কথাসাহিত্যের অপর খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক Sir Walter Scott(1771-1832) ও এর  প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না।সমালোচকের পর্যবেক্ষণে সমকালে কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ধর্মীয় লোকাচার,ইতহাস-ঐতিহ্যের সাথে রাষ্ট্র ও সমাজনীতির পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের

ব্যাপক চিত্র Sir Walter Scott এর বিখ্যাত উপন্যাস

‘Old Mortality ‘(1816),’The Bride of Lammermoor'(1819) , ‘Ivanhoe'(1820) প্রভৃতি উপন্যাসে নির্দ্বিধতায় বিজ্ঞাপিত হয়েছে জীবন বাস্তবতায়-মানুষ আর মানবতা,প্রান্তিক জীবনের ক্ষয়িষ্ণু  ধারায় কীর্তিত হয়েছে আঞ্চলিক উপন্যাসের

প্রমিত চিত্র। এধারায় আঞ্চলিক উপন্যাসভাবনার নান্দনিক অনুক্ত উপলব্ধি থেকে এই প্রথম অস্থির  জীবনদর্শনের বৃত্ত ভেঙ্গে তারাশঙ্কর সুস্থ মাটি ঘেঁষা সমাজজীবনের পটভূমিতে নিজেকে মেলে ধরলেন। তাঁর হাত থেকেই বেরিয়ে আসে বাংলাসাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাস ‘গণদেবতা'(১৯৪২)

 

“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

০৩-০৪-২০১৮

“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

Related Posts