গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রবন্ধ

ড.এস এ মুতাকাব্বির মাসুদের প্রবন্ধ- কথাসাহিত্যিক শওকত আলী

কথাসাহিত্যিক শওকত আলী
ড.এস এ মুতাকাব্বির মাসুদ


১. উনিশ শতকের ষাটের দশকে বাংলা কথাসাহিত্যে শওকত আলী একটি দ্যোতিত সত্তার নাম।সমকালীন ইতিহাসের অমসৃণ পথ পেরিয়ে বাংলাসাহিত্যে নিজের আসনটি গৌরবের সাথে দক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে যাঁর সাহিত্যসভায় দীপ্ত বিচরণ তিনি জন্মে ছিলেন ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ শহরে।
পিতা, খোরশেদ আলী সরকার, মাতা, সালেমা খাতুন।

২. বাংলা কথাসাহিত্যের নন্দিত পৃষ্ঠায় রাজনৈতিক, ধর্ম, অর্থনীতি, মাটি- মানুষ আর মানবতার পাশাপাশি তাঁর লেখায় ওঠে এসেছে আমাদের ঘরের অতি পরিচিত জীবনবাস্তবতায় অন্বিত মানুষ,সমাজ,রাষ্ট্র আর সমাজে বিদ্যমান অসংগতির জীবন ঘনিষ্ঠ চিত্রকলা।প্রথাবিরোধী এ ঔপন্যাসিক নিজেকে খোঁজেছেন প্রত্যয়ের সাথে অবিরাম প্রেম ভালোবাসার মাঝে। রুদ্র সময়ের
অনৃত পথকে নির্দ্বিধতায় মাড়িয়ে গেছেন আলোর সন্ধানে। আলোকিত এ ঔপন্যাসিক জীবনকে দেখেছেন নিজের মতো করে; তাঁর রচিত উপন্যাসেও আমরা সে ছবির সচিত্র প্রতিবেদন দৃশ্যমান হতে দেখি।

৩. সাহিত্যের অধুনাতন শিল্প হচ্ছে উপন্যাস।যেখানে জীবনের সামগ্রিক চিত্রটাই নান্দনিক উপলব্ধির নন্দিত অনুভে- কোনো খণ্ডাংশ নয় জীবন আর সময়ের সম্পূরক চিত্রটটাই উপস্থাপিত
হয়।এ ধারায় ঔপন্যাসিক শওকত আলী তাঁর গল্প ও উপন্যাসে সমান দক্ষতার অসামান্য পরিচয় রেখেছেন। আর বাংলা কথাসাহিত্যের অতুল ক্রমোদ্ভব ও বিকাশ বলা যায় তাঁর হাত থেকেই শুরু।
এ পথে হাঁটতে যেয়েই তাঁর মানুষের কাছাকাছি আসা।শিল্পিত বিভবে কথাসাহিত্যের উঠোনকে
নিজের মতো করে সাজানোর অভিপ্রায়ে সামগ্রিক জীবন আর সমাজ বাস্তবতার কোমল-কঠিন
পথে নিজেকে মেলে ধরেছেন ; তাঁর মেধাবী অনুভূতির দীপ্ত বোধ থেকেই এ প্রজন্মের হাতে উপন্যাস হয়ে ওঠে সাহিত্যেরর আধুনিক শিল্প।তাঁর উপন্যাসের বিস্তৃৃতি ও পরিধী বস্তুনিষ্ঠ বিষয়-বস্তুর প্রেক্ষিত,প্রতর্ক্য বিবেচনায় পাশ্চাত্য ঔপন্যাসিক স্যার ওল্টার স্কট(১৭৭১-১৮৩২)এর কথাও মনে আসতে পারে। তাঁর লেখায়ও সমকালের সংস্কৃতি,কৃষ্টি,ধর্মীয় লোকাচার, ইতিহাস ঐতিহ্য, রাষ্ট্র ও সমাজনীতির পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের ব্যাপক চিত্র অনায়াস ওঠে এসেছে তাঁরই বিখ্যাত ‘ The Bride of Lammermoor'(1819), ‘Ivanhoe’ (1820) ইত্যাদি উপন্যাসে।

৪. শওকত আলী বাংলা কথাসাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা প্রাণপুরুষ।তিনি একাধারে কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিক্ষক। উনিশ শতকের বাংলা কথাসাহিত্যের গল্প ও উপন্যাসের অনিবার্য দ্যোতক। অবিরাম লিখেছেন হাত খুলে। সব্যসাচীর মতো উদ্দীপিত মননে ও অনুধ্যানে।তাঁর হাত থেকে বেড়িয়েছে ক্রমাগত কালজয়ী সব গল্প ও উপন্যাস।

৫. ষাটের দশকে তাঁর হাত থেকে প্রথমেই বেড়িয়ে আসে ‘পিঙ্গল আকাশ'(১৯৬৩), ‘যাত্রা'(১৯৭৬),
‘ প্রদোষে প্রাকৃতজন'(১৯৮৪),যে উপন্যাসটি তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয।’অপেক্ষা'(১৯৮৪),
ত্রয়ী উপন্যাস-‘দক্ষিণায়নের দিন'(১৯৮৫),’কুলায় কালস্রোত'(১৯৮৬),’পূর্বরাত্রি পূর্বদিন'(১৯৮৬),
‘সম্বল'(১৯৮৬),’গন্তব্যে অতঃপর'(১৯৮৭),’ভালোবাসা কারে কয়'(১৯৮৮), ‘ওয়ারিশ'(১৯৮৯),’বাসর ও মধুচন্দ্রিমা'(১৯৯০),’উত্তরের খেপ'(১৯৯১), ‘প্রেমকাহিনী'(১৯৯১), ‘পতন'(১৯৯২), ‘অবশেষে প্রপাত'(১৯৯৬),’দলিল'(২০০০),’জননী ও জাতিকা'(২০০১),’হিসাব নিকাস'(২০০১),’স্ববাসে প্রবাসে'(২০০১),’তনয়ার স্বীকারোক্তি ‘(২০০১),’জোড় বিজেড়'(২০০১),’ঘরবাড়ি'(২০০১), ‘শেষ বিকেলের রোদ'(২০০১), ‘এক ডাইনীর খেলা'(২০০১), ‘নাঢ়াই'(২০০৩), ‘বসত'(২০০৫), ‘স্থায়ী ঠিকানা'(২০০৫),
‘দুইরকম'(২০০৫),’কাহিনী ও কথোপকথন'(২০০৭), ‘মাদার ডাঙ্গার কথা'(২০১১),
তার লেখা কালজয়ী গল্পগুলো যথাক্রমে ‘উন্মুল বাসনা'(১৯৬৮),’লেলিহান সাধ'(১৯৭৮),’শুন হে লখিন্দর ‘(১৯৮৮),’বাবা আপনে যান'(১৯৯৪), ‘দিন গুজরান'(২০০৬) প্রভৃতি।

৬. বস্তুত কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর নবম শ্রেণিতে ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর লেখার জগতে মেধাবী যাত্রা।পর্যবেক্ষণে ওঠে আসে ভারত ভাগের পর ‘নতুন সাহিত্য’ নামে একটি পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প
প্রকাশিত হয়।উল্লেখ্য পত্রিকাটির পরিচালনায় ছিলো কলকাতারর বামপন্থীরা। এরপর তাঁর অনেক গল্প, কবিতা এবং শিশুতোষ লেখা অবিরত প্রকাশিত হতে দেখা যায়’দৈনিক মিল্লাত’,’ মাসিক সমকাল’, দৈনিক ইত্তেফাক ‘ এ।
৭. এই খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক শওকত আলী স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে গল্প-উপন্যাসে এক নবীকৃত ধারার সূচনা করায় ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন।তার আগে তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস ‘দক্ষিণায়নের দিন’,’কুলায় কালস্রোত’, এবং ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন ‘এর জন্য পেয়েছেন ‘ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার'(১৯৮৬)। এ ত্রয়ী উপন্যাস নিয়ে একটি সাক্ষাৎকারে শওকত আলী বলেন “ষাটের দশকে মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার যে পরিবর্তন আসছে,
সেটাই ‘দক্ষিণায়নের দিন’ যার মানে হচ্ছে শীতকাল আসছে।’কুলায় কালস্রোত ‘ হচ্ছে পরিবর্তন যখানে আঘাত করছে।আর ‘ পূর্বরাত্রি পূর্বদিন ‘ হচ্ছে নতুন সময়টি আসার একেবারে আগের সময়টি।মূলত ষাটের দশকে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং সমগ্র সমাজ ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসে।
নতুন একটা চিন্তা-চেতনা দ্বারা আলোড়িত হয় পুরো সমাজ।ধ্যান-ধারণা চাল-চলন জীবনব্যবস্থায়
একটা পরিবর্তনের সুর বেজে ওঠে।সেসবই উপন্যাসে আনতে চেয়েছি।”

৮. বস্তুত কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর উপন্যাস শিল্পের বহুমাত্রিক উৎকর্ষ উপস্থাপনের প্রয়াস
নিঃসন্দেহে সফল। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য।
আমরা সর্বমনে তাঁর সুস্থ জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
দোয়া করি তিনি যেনো দ্রুতই সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে
ফিরে আসেন।

তারিখ: ০৯-০১-২০১৮

Related Posts